দ্বাদশ শ্রেণিতে উঠে রসায়ন ২য় পত্র খুলে অনেকেই একটু থমকে যায়। ১ম পত্রের সাথে এর চরিত্রই আলাদা।
১ম পত্রে যা শিখেছো — পরমাণুর গঠন, বন্ধন, সাম্যাবস্থা — সেগুলো ছিল ভিত্তি। ২য় পত্রে সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আসল প্রয়োগ শুরু হয়। আর বিক্রিয়ার সংখ্যা এত বেশি যে প্রথম দেখায় মনে হয় এত কিছু মনে রাখা অসম্ভব।
অসম্ভব নয়, যদি সাজিয়ে পড়ো। কীভাবে সাজাবে সেটাই নিচে বলছি।
পাঁচটি অধ্যায়ে তোমার কাজ কী
১. পরিবেশ রসায়ন — বায়ুমণ্ডলের স্তর, দূষণের কারণ ও প্রভাব, ওজোন ক্ষয়, গ্রিনহাউস প্রভাব। এখানে হিসাব নেই, বোঝা ও গুছিয়ে লেখার কাজ। কারণ-ফলাফলের শৃঙ্খলটা ধরতে পারলেই সৃজনশীলে ভালো করা যায়।
২. জৈব রসায়ন — যৌগের নামকরণ, প্রস্তুতি, বিক্রিয়া ও শনাক্তকরণ। ২য় পত্রের অর্ধেকের বেশি পরিশ্রম এখানেই। আলাদা পরিকল্পনা লাগে, নিচে সেটা আছে।
৩. পরিমাণগত রসায়ন — দ্রবণের ঘনমাত্রার হিসাব আর টাইট্রেশনের অঙ্ক। এখানে মূল কাজ হিসাব করা, মুখস্থ করা নয়। মোলারিটি-নরমালিটির সম্পর্কটা একবার পরিষ্কার হলে বাকি অঙ্ক একই ছাঁচে চলে।
৪. তড়িৎ রসায়ন — কোন ইলেকট্রোডে কী ঘটছে সেটা বোঝা, তড়িৎদ্বার বিভব নির্ণয়, কোষের কার্যপ্রণালী ব্যাখ্যা। জারণ-বিজারণের ধারণা পরিষ্কার না থাকলে এই অধ্যায়ে ঢোকাই উচিত নয় — আগে ১ম পত্রের ওই অংশটা ঝালিয়ে নাও।
৫. অর্থনৈতিক রসায়ন — শিল্পে উৎপাদনের ধাপ, কাঁচামাল ও শর্ত। বর্ণনামূলক, দ্রুত শেষ হয়, আর নম্বর তুলনামূলক সহজে আসে। শেষ অধ্যায় বলে বাদ দিয়ে দেওয়াটা সরাসরি নম্বর ছেড়ে দেওয়া।
জৈব রসায়ন: তিনটে বিক্রিয়াই আসল
শত শত বিক্রিয়া দেখে ভয় পাওয়ার আগে একটা জিনিস জেনে রাখো — জৈব বিক্রিয়া মূলত তিন ধরনের।
প্রতিস্থাপন — একটা পরমাণু বা মূলকের জায়গায় আরেকটা বসে। অ্যালকেনের হ্যালোজেনেশন এই ধরনের।
যুত — দ্বি-বন্ধন বা ত্রি-বন্ধন ভেঙে নতুন কিছু যুক্ত হয়। অ্যালকিন ও অ্যালকাইনের বেশিরভাগ বিক্রিয়া এখানে পড়ে।
অপসারণ — অণু থেকে ছোট কিছু বেরিয়ে গিয়ে বন্ধন তৈরি হয়। অ্যালকোহল থেকে পানি সরিয়ে অ্যালকিন বানানো এর উদাহরণ।
নতুন কোনো বিক্রিয়া দেখলে প্রথমে জিজ্ঞেস করো — এটা কোন ধরনের? উত্তরটা জানা থাকলে অর্ধেক কাজ হয়ে যায়, কারণ প্রতিটা ধরনের নিজস্ব নিয়ম আছে।
মূলক ধরে পড়ার পদ্ধতি — একটা নমুনা
প্রতিটা যৌগের বিক্রিয়া আলাদা করে মুখস্থ করার দরকার নেই। কার্যকরী মূলক ধরে শিখলে একটা শিখলেই পুরো শ্রেণি চলে আসে। প্রতিটা মূলকের জন্য এক পাতা বরাদ্দ রাখো, আর সেই পাতাটা দেখতে হবে এরকম:
অ্যালকোহল (–OH)
গঠন: R–OH। ১°, ২°, ৩° — কার্বনের সাথে কয়টা কার্বন যুক্ত তার ওপর ভাগ।
প্রস্তুতি: অ্যালকিনের সাথে পানি যুক্ত করে; অ্যালকাইল হ্যালাইডের আর্দ্রবিশ্লেষণে।
প্রধান বিক্রিয়া: সোডিয়ামের সাথে বিক্রিয়ায় হাইড্রোজেন গ্যাস; জারণে অ্যালডিহাইড বা কিটোন; কার্বক্সিলিক অ্যাসিডের সাথে এস্টারীকরণ; ঘন সালফিউরিক অ্যাসিড দিয়ে অপসারণে অ্যালকিন।
শনাক্তকরণ: লুকাস বিকারক দিয়ে ১°, ২°, ৩° আলাদা করা যায়; আয়োডোফর্ম পরীক্ষায় নির্দিষ্ট গঠনের অ্যালকোহল ধরা পড়ে।
এভাবে অ্যালডিহাইড, কিটোন, কার্বক্সিলিক অ্যাসিড, অ্যামিন — প্রতিটার জন্য এক পাতা। ছয়-সাত পাতাতেই পুরো জৈব রসায়ন গুছিয়ে ফেলা যায়, আর পরীক্ষার আগের রাতে ওই পাতাগুলোই যথেষ্ট।
সময় ভাগ করবে যেভাবে
জৈব রসায়নকে একটা অধ্যায় ভেবো না — কয়েকটা ছোট ভাগে ভাগ করো: নামকরণ, অ্যালকেন-অ্যালকিন-অ্যালকাইন, অ্যালকোহল, অ্যালডিহাইড ও কিটোন, কার্বক্সিলিক অ্যাসিড, অ্যারোমেটিক যৌগ। এক এক করে শেষ করো। পুরোটা একবারে ধরতে গেলে মাঝপথে হাল ছেড়ে দেওয়ার আশঙ্কা বেশি।
পরিমাণগত ও তড়িৎ রসায়ন পাশাপাশি রাখো — দুটোতেই হিসাব, আর অঙ্কের ছন্দ একবার এলে দুটোই দ্রুত এগোয়।
পরিবেশ ও অর্থনৈতিক রসায়ন শেষে রাখা যায়। পড়তে সময় কম লাগে, পরীক্ষার আগেও ধরা যায়।
বইটা নামাবে যেখান থেকে
এনসিটিবির ওয়েবসাইটে একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির তালিকা থেকে রসায়ন ২য় পত্র নামিয়ে নাও — বিনামূল্যে, কোনো রেজিস্ট্রেশন ছাড়াই। ঠিকানার শেষে .gov.bd আছে কিনা দেখে নিও।
এনসিটিবি অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে যান →
এই বইটার ক্ষেত্রে প্রিন্ট করাটা বিশেষভাবে দরকার। জৈব রসায়নের গঠন-চিত্র আর বিক্রিয়ার ধাপ ফোনের স্ক্রিনে দেখা যায় না বললেই চলে — আর পাশে খাতা রেখে গঠন আঁকতে না পারলে এই অধ্যায় শেখাই যায় না। অন্তত জৈব রসায়নের অংশটুকু প্রিন্ট করে নিও।
ব্যবহারিকের সাথে যোগসূত্র
রসায়নের ব্যবহারিকে টাইট্রেশন বড় জায়গা নেয়, আর তার পুরো তত্ত্ব পরিমাণগত রসায়ন অধ্যায়ে। তাই অধ্যায়টা পড়ার সময়ই ব্যবহারিক খাতার সংশ্লিষ্ট অংশ লিখে ফেলো — এক পরিশ্রমে দুই কাজ, আর মৌখিক পরীক্ষায় প্রশ্ন করলে উত্তরও দিতে পারবে।
জৈব রসায়নের শনাক্তকরণ পরীক্ষাগুলোও ব্যবহারিকে আসে। মূলকের পাতায় শনাক্তকরণের অংশটা লেখার সময় ব্যবহারিক খাতার কথাটাও মাথায় রেখো।
সংশ্লিষ্ট লেখা
রসায়ন ১ম পত্র বই PDF ডাউনলোড
রসায়ন ১ম পত্র সমাধান — অধ্যায়ভিত্তিক প্রশ্ন ও সমাধান
HSC সিলেবাস — বিজ্ঞান বিভাগ
শেষে একটা কথা। রসায়ন ২য় পত্র শেষ তিন মাসে শেষ করা যায় না — অন্তত জৈব রসায়ন যায় না। দ্বাদশের শুরু থেকেই সপ্তাহে দুটো দিন এর জন্য রাখো। যারা রাখে, পরীক্ষার আগে তাদের শুধু ঝালিয়ে নিতে হয়। বাকিদের তখন নতুন করে শিখতে হয়, আর তখন সময় থাকে না।