জৈব রসায়নে শিক্ষার্থীরা যে ভুলটা করে, সেটা পড়ার ভুল নয় — সাজানোর ভুল। বিক্রিয়াগুলোকে আলাদা আলাদা তথ্য হিসেবে মুখস্থ করার চেষ্টা করে। পঞ্চাশটা বিক্রিয়া আলাদা করে মনে রাখা অসম্ভব।
অথচ পুরো অধ্যায়টা আসলে একটা মানচিত্র। কার্বন যৌগগুলো একটা শৃঙ্খলে সাজানো, আর প্রতিটা তীরের উপরে লেখা কোন বিকারক দিয়ে এক ঘর থেকে আরেক ঘরে যাওয়া যায়।
সেই মানচিত্রটা একবার মাথায় বসে গেলে যেকোনো প্রশ্নের উত্তর বের করা যায়, এমনকি যেটা মুখস্থ করোনি সেটাও।
জৈব রসায়ন হলো কার্বন যৌগের রসায়ন, যেখানে যৌগের ধর্ম নির্ধারণ করে তার কার্যকরী মূলক। একই কার্বন শিকলে −OH বসলে সেটা অ্যালকোহল, −CHO বসলে অ্যালডিহাইড, −COOH বসলে এসিড। শিকল একই, চরিত্র আলাদা।
কার্যকরী মূলক চিনে নাও
| শ্রেণি | মূলক | নাম শেষ হয় |
|---|---|---|
| অ্যালকেন | C−C একক বন্ধন | -ane |
| অ্যালকিন | C=C | -ene |
| অ্যালকাইন | C≡C | -yne |
| অ্যালকোহল | −OH | -ol |
| অ্যালডিহাইড | −CHO | -al |
| কিটোন | >C=O | -one |
| কার্বক্সিলিক এসিড | −COOH | -oic acid |
| এস্টার | −COO− | -oate |
মূল পথটা: অ্যালকোহল থেকে এসিড
এই একটা পথ ধরলে অর্ধেক অধ্যায় ধরা পড়ে।
প্রাথমিক অ্যালকোহলকে মৃদু জারক (PCC) দিয়ে জারিত করলে থেমে যায় অ্যালডিহাইডে। কিন্তু তীব্র জারক (অ্যাসিডীয় K₂Cr₂O₇) দিলে থামে না, এগিয়ে গিয়ে কার্বক্সিলিক এসিড হয়।
মাধ্যমিক অ্যালকোহল জারিত হয়ে কিটোন হয়, আর সেখানেই থেমে থাকে।
তৃতীয়ক অ্যালকোহল সহজে জারিত হয়ই না।
কেন হয় না, সেটা বুঝলে আর মুখস্থ করতে হবে না। জারণের জন্য যে কার্বনে −OH বসে আছে সেই কার্বনে অন্তত একটা হাইড্রোজেন থাকা লাগে। তৃতীয়ক অ্যালকোহলে ওই কার্বনটা তিন দিকেই কার্বন দিয়ে ঘেরা — হাইড্রোজেনের জায়গাই নেই।
শনাক্তকরণ: কোনটা কোনটা
অ্যালডিহাইড আর কিটোন দুটোতেই C=O আছে। পার্থক্য করবে কীভাবে?
টলেন বিকারক দিয়ে। অ্যামোনিয়াকাল সিলভার নাইট্রেটের সাথে অ্যালডিহাইড বিক্রিয়া করে পরীক্ষানলের গায়ে রূপালি আস্তরণ ফেলে — তাই একে রূপালি আয়না পরীক্ষা বলে। কিটোন কিছুই করে না।
ফেলিং দ্রবণেও একই গল্প। অ্যালডিহাইড লাল অধঃক্ষেপ (Cu₂O) দেয়, কিটোন দেয় না।
কারণটা সরল — অ্যালডিহাইড সহজে জারিত হয়ে এসিড হয়ে যায়, কিটোনের সেই ক্ষমতা নেই। তাই যেকোনো মৃদু জারক দিয়েই দুটোকে আলাদা করা যায়।
আর আয়োডোফর্ম পরীক্ষা ধরে CH₃CO− বা CH₃CH(OH)− গ্রুপ। হলুদ অধঃক্ষেপ পড়লে বুঝতে হবে গ্রুপটা আছে। ইথানল আর অ্যাসিটোন এই পরীক্ষা দেয়, মিথানল দেয় না — এই তুলনাটা প্রশ্নে আসে।
অ্যালকিনের সংযোজন ও মার্কনিকভ
দ্বিবন্ধনে সংযোজন বিক্রিয়া ঘটে। H₂ যোগ করলে অ্যালকেন, HBr যোগ করলে অ্যালকাইল হ্যালাইড।
প্রশ্ন হলো, অপ্রতিসম অ্যালকিনে হাইড্রোজেনটা কোন কার্বনে বসবে?
মার্কনিকভের নিয়ম বলে — যে কার্বনে আগে থেকেই বেশি হাইড্রোজেন আছে, সেখানেই নতুন হাইড্রোজেন যাবে। ছাত্রছাত্রীরা একে মনে রাখে এক লাইনে: যার আছে, তাকেই আরও দেওয়া হয়।
এস্টারিফিকেশন
কার্বক্সিলিক এসিড আর অ্যালকোহল গাঢ় সালফিউরিক এসিডের উপস্থিতিতে বিক্রিয়া করে এস্টার ও পানি দেয়।
এস্টারই ফলের গন্ধের উৎস, আর কৃত্রিম ফ্লেভারে এদের ব্যবহার হয়। বিক্রিয়াটা উভমুখী, তাই তৈরি হওয়া পানিটা সরিয়ে নিলে উৎপাদের পরিমাণ বাড়ে — লা শাতেলিয়ারের নীতি এখানে সরাসরি খাটে।
নামকরণে যে ভুলটা সবচেয়ে বেশি
IUPAC নামকরণের ধাপ তিনটি। দীর্ঘতম কার্বন শিকল খোঁজা, কার্বনগুলোয় নম্বর দেওয়া, তারপর শাখার নাম আগে বসিয়ে মূল শিকলের নাম লেখা।
ভুল হয় দ্বিতীয় ধাপে। নম্বর কোন দিক থেকে শুরু করবে?
নিয়ম হলো — কার্যকরী মূলক যেন ছোট নম্বর পায়। কার্যকরী মূলক না থাকলে শাখা যেন ছোট নম্বর পায়। দুই দিক থেকেই গুনে দেখো, কোন দিকে ছোট নম্বর আসে সেটাই ঠিক দিক।
CH₃−CH(CH₃)−CH₂−CH₃ যৌগটির নাম 2-methylbutane। ডান দিক থেকে গুনলে শাখাটা তিন নম্বরে পড়ত, বাঁ দিক থেকে দুই নম্বরে — তাই বাঁ দিকই সঠিক।
খাতায় লেখার সময়
তীরের উপরে শর্ত লিখতে ভুলো না — প্রভাবক, তাপমাত্রা, বিকারকের নাম। শুধু বিক্রিয়ক আর উৎপাদ লিখলে অর্ধেক নম্বর কাটা যায়, কারণ শর্তটাই প্রমাণ করে তুমি বিক্রিয়াটা বুঝেছ।
গঠন আঁকার পর প্রতিটা কার্বনের বন্ধন গুনে দেখো — চারটার কম বা বেশি হলে গঠনটাই ভুল।
অনুশীলন
- প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও তৃতীয়ক অ্যালকোহলের জারণের পার্থক্য সমীকরণসহ দেখাও।
- অ্যালডিহাইড ও কিটোন আলাদা করার দুটি পরীক্ষা বর্ণনা করো।
- মার্কনিকভের নিয়ম উদাহরণসহ ব্যাখ্যা করো।
- ইথানল থেকে ইথানয়িক এসিড প্রস্তুতির বিক্রিয়া লেখো।
- CH₃−CH₂−CH(CH₃)−CH₂−OH যৌগটির IUPAC নাম নির্ণয় করো।
পড়া শেষ করে একটা কাজ করো — সাদা কাগজে অ্যালকেন থেকে শুরু করে কার্বক্সিলিক এসিড পর্যন্ত পুরো রূপান্তরের চার্টটা নিজের হাতে আঁকো, প্রতিটা তীরের উপরে বিকারকের নাম লিখে। বই দেখে নয়, মাথা থেকে। যেখানে আটকে যাবে, সেখানেই তোমার ফাঁক।