HSC এর পর কী করবো — বিভাগভিত্তিক পথগুলো একসাথে

পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরের কয়েকটা সপ্তাহ অদ্ভুত। কোচিংয়ের ভিড় বাড়ে, বন্ধুদের মুখে নানা কথা, আর বাসায় প্রশ্ন — এবার কী? এই লেখাটা সেই প্রশ্নের একটা গোছানো উত্তর দেওয়ার চেষ্টা। কোনো একটা পথকে সেরা বলা হবে না, কারণ সেরা পথ বলে কিছু নেই। তোমার ফল, আগ্রহ আর পরিবারের অবস্থা মিলিয়ে যেটা মানানসই, সেটাই তোমার পথ।

প্রথমে যেটা বোঝা দরকার

ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি আর বোর্ড পরীক্ষার প্রস্তুতি এক নয়। বোর্ডে লিখে বোঝাতে হয়, ভর্তি পরীক্ষায় দ্রুত চিনতে হয়। MCQ-তে সময় প্রতি প্রশ্নে এক মিনিটেরও কম। তাই ফল প্রকাশের অপেক্ষায় বসে না থেকে পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরপরই প্রস্তুতি শুরু করাই বুদ্ধিমানের কাজ — এই সময়টা প্রতি বছর অনেকে নষ্ট করে ফেলে।

বিজ্ঞান বিভাগের জন্য

মেডিকেল ও ডেন্টাল। সারা দেশে একটি সমন্বিত পরীক্ষা হয়। জীববিজ্ঞান, রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞান ও ইংরেজি থেকে প্রশ্ন আসে, সাথে সাধারণ জ্ঞান। এসএসসি ও এইচএসসির জিপিএ থেকেও নম্বর যোগ হয়, তাই আগের ফলটাও এখানে কাজে লাগে। মনে রাখা দরকার, নেগেটিভ মার্কিং থাকে — অনুমানে দাগানোর অভ্যাস এখানে ক্ষতি করে।

প্রকৌশল। বুয়েট, কুয়েট, রুয়েট, চুয়েট — এখানে গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের গভীরতা সবচেয়ে বেশি চাওয়া হয়। বুয়েটে সাধারণত প্রাথমিক বাছাই পরীক্ষা হয়, তারপর মূল পরীক্ষা। উচ্চতর গণিত ভালো না লাগলে এই পথে কষ্ট হবে, এটা আগেই ভেবে নেওয়া ভালো।

সাধারণ ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, জাহাঙ্গীরনগরসহ বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজস্ব পরীক্ষা নেয়। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি সমন্বিত পরীক্ষা হয়। এছাড়া গুচ্ছভুক্ত (GST) বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একবার পরীক্ষা দিয়ে অনেকগুলোতে আবেদন করা যায় — খরচ ও ধকল দুটোই কমে।

ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের জন্য

বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় অনুষদ, আইবিএ, এবং গুচ্ছভুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় — মূল পথ এগুলোই। হিসাববিজ্ঞান, ব্যবস্থাপনা, ফিন্যান্স ও ইংরেজির প্রস্তুতি লাগে। আইবিএ-র পরীক্ষা আলাদা ধরনের — গণিত, ইংরেজি ও বিশ্লেষণী দক্ষতা যাচাই করা হয়, মুখস্থে কাজ হয় না।

অনেকে জানে না যে ব্যবসায় শিক্ষা থেকেও অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ইউনিটে আবেদন করা যায়। সার্কুলার বের হলে যোগ্যতার শর্তটা মন দিয়ে পড়ো, ধরে নিও না।

মানবিক বিভাগের জন্য

কলা ও সমাজবিজ্ঞান অনুষদ, আইন, সাংবাদিকতা, লোকপ্রশাসন, অর্থনীতি — বিকল্প কম নয়। বাংলা, ইংরেজি, সাধারণ জ্ঞান ও সাধারণ গণিতের প্রস্তুতি লাগে। মানবিকের শিক্ষার্থীদের একটা বাড়তি সুবিধা আছে — সাধারণ জ্ঞান ও ইংরেজিতে ভালো দখল থাকলে বিসিএস থেকে শুরু করে ব্যাংক, সব প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাতেই সেটা কাজে লাগে।

বিশ্ববিদ্যালয়ই একমাত্র পথ নয়

এই কথাটা কম বলা হয়, অথচ বলা দরকার। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজে অনার্স পড়ে অনেকে ভালো জায়গায় পৌঁছেছে। ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং, নার্সিং, টেক্সটাইল, মেরিন — এসব পেশাভিত্তিক পথেও কাজের নিশ্চয়তা ভালো। আবার কেউ কেউ পড়ার পাশাপাশি দক্ষতাভিত্তিক কাজ শিখে নেয়, যেটা এখন আয়ের বাস্তব উৎস।

ভর্তি পরীক্ষায় একবার না হলে জীবন থেমে যায় না। প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে এটা ঘটে, আর তাদের বেশিরভাগই পরে ঠিকঠাক জায়গায় পৌঁছায়।

এখন যে কাজগুলো করা দরকার

নিজের ফলের একটা বাস্তব হিসাব করো, তারপর সেই অনুযায়ী দুই-তিনটা লক্ষ্য ঠিক করো — একটা স্বপ্নের, একটা মাঝারি, একটা নিরাপদ। সব ডিম এক ঝুড়িতে রাখা এখানে ঝুঁকিপূর্ণ।

প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্কুলার নিজে পড়ো। শোনা কথায় ভরসা করে আবেদন করতে গিয়ে প্রতি বছর অনেকে যোগ্যতার শর্তে আটকে যায়।

আর কোচিং নিয়ে একটা কথা — কোচিং সাহায্য করতে পারে, কিন্তু কোচিং নিজে থেকে কাউকে চান্স পাইয়ে দেয় না। যে বিজ্ঞাপনে শতভাগ নিশ্চয়তার কথা বলা হয়, সেটা বিজ্ঞাপনই। নিজের পড়ার সময়টাই আসল।

Leave a Comment

Discover more from BDAcademic

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading